
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (পাবনা-১)
জামায়াতে ইসলামীর আমীর। শীর্ষ এই স্বাধীনতাবিরোধী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং পূর্ব পাকিস্তান আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। তার নির্দেশে সারাদেশে ব্যাপক গণহত্যা পরিচালিত হয়। এই যুদ্ধাপরাধীর প্রত্যক্ষ মদদে পাবনায় হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধা বটেশ্বর, দারা, চাঁদ, মোসলেম, আখতারসহ অনেককে। তার নির্দেশে নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (ফরিদপুর-৩)
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ও ছাত্রসংঘের (বর্তমান ছাত্রশিবির) পূর্ব-পাকিস্তান শাখার সভাপতি ছিলেন। তার আড্ডাস্থল শেখ ভিলা, ৩/৫ নয়াপল্টন ও ফকিরাপুল ১৮১ গরম পানির গলির বাড়িটি। এখানে তিনি বাঙালিদের ধরে এনে নির্যাতন করতেন। তার নির্দেশে ও নেতৃত্বে হত্যা করা হয় বাঙালিদের। তিনি বক্তৃতা ও বিবৃতিতে স্বাধীনতার বিপক্ষে কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়মাস।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৬)
বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত আছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি নিজেকে ‘ব্রিগেডিয়ার’ পরিচয় দিতেন, তার নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনারা রাউজানকে হাজারো হত্যার মাধ্যমে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে। ভয়ঙ্কর মেজাজের এই যুদ্ধাপরাধী কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নতুন চন্দ্র সিংহকে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেন।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (শেরপুর-১)
শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়ার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ময়মনসিংহ জেলা বদরবাহিনীর কমান্ডার এবং জামালপুরের বদরবাহিনীর প্রধান সংগঠক তিনি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্কুলছাত্র কাজল ও কলেজছাত্র গোলাম মোস্তাকসহ বহু হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। জনপ্রিয় অধ্যক্ষ সৈয়দ হান্নানকে গলায় জুতোর মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘুরিয়ে ছিলেন।
মাওলানা আবদুস সুবহান (পাবনা-৫)
জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি পাবনা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর ও শান্তি কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। অনর্গল উর্দু বলতে পারদর্শী এই স্বাধীনতাবিরোধী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন। তার নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। ’৭১ সালের ২৬ মার্চ বিকালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে একশ নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে নির্যাতন শেষে হত্যা করেন।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (পিরোজপুর-১)
জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শূরার সদস্য। পাকবাহিনীকে সহায়তার জন্য একাত্তরে এই যুদ্ধাপরাধী নিজ এলাকায় আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করেন। লুণ্ঠিত মালামাল ভাগ-বাটোয়ারার জন্য তার নেতৃত্বে ‘পাঁচ তহবিল’ নামে একটা কমিটি গঠন করেন। হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নারীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। ’৭১-এর ১৯ ডিসেম্বর থেকে জয়পুরহাটে আত্মগোপন করেন এবং ১৯৮৫ সালে প্রকাশ্যে আসেন।
এস এ খালেক (ঢাকা-১৪)
মুক্তিযুদ্ধের সময় এই স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য ও লালবাগ থানার সংযোগ কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি বিএনপি রাজনীতিতে জড়িত এবং ওই দলের সাবেক সাংসদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিহারীদের সঙ্গে নিয়ে বাঙালি নিধনযজ্ঞে অংশ নেন। আইয়ুব খানের সঙ্গে এই ঘাতকের মুক্তিযুদ্ধকালীন আলোকচিত্রও রয়েছে।
এটিএম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২)
রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়ার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সম্পাদক।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রংপুর জেলা ছাত্রসংঘের সভাপতি ও আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। শীর্ষস্থানীয় এই যুদ্ধাপরাধী কারমাইকেল কলেজের ছয় শিক্ষক এবং একজন শিক্ষকের স্ত্রীকে হত্যাসহ বহু হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীকালে ঢাকায় এসে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে স্থাপিত ‘নির্যাতন সেলে’ নির্মম নির্যাতন শেষে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি সঙ্গীয়সহ পাকিস্তান পালিয়ে যান এবং ’৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে আসেন।
মাওলানা আবদুল আজিজ (গাইবান্ধা-১)
জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। স্বাধীনতাবিরোধী এই রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা ভেবে রাতের আঁধারে একপাল ঘোড়াকে গুলি করে হত্যা করায় ‘ঘোড়ামারা আজিজ’ আখ্যা পান। রাজাকার সালুকে সঙ্গে নিয়ে এই স্বাধীনতাবিরোধী আজিজ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নির্যাতন-লুণ্ঠন অভিযানেও অংশ নিয়েছিলেন।
এএম রিয়াছাত আলী বিশ্বাস (সাতক্ষীরা-৩)
জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শূরার সদস্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আশাশুনি উপজেলা শান্তি কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী এই রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস, সোহরাব, আলী ও খগেন্দ্রনাথ হত্যাকাণ্ডের হোতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটেও নেতৃত্ব দেন। তিনি ভারতগামী শরণার্থীদের নৌকা লুট করে সর্বস্ব কেড়ে নিতেন। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েও প্রাণভিক্ষা পান। যে ব্যক্তি তাকে প্রাণভিক্ষা দিয়েছিল পরবর্তী সময়ে রিয়াছাত তারই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন।
ফরিদউদ্দিন চৌধুরী (সিলেট-৫)
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি সিলেট জেলা ছাত্রসংঘের সভাপতি ও সিলেট জেলা আলবদর বাহিনীর সংগঠক ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জেনে সে সব তথ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সরবরাহ করতেন। এ ছাড়া সম্পত্তি দখল, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও লুটপাটেও অংশ নেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে আত্মগোপনে চলে গেলেও জেনারেল জিয়ার আমলে তিনি পুনর্বাসিত হন।
মাওলনা আবদুল খালেক মণ্ডল (সাতক্ষীরা-২)
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি সাতক্ষীরা জেলা শান্তিবাহিনীর সভাপতি ছিলেন। এই যুদ্ধাপরাধী পাক সেনাবাহিনীকে ‘নারী’ সরবরাহে লিপ্ত ছিলেন। যুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি সাতক্ষীরা সরকারি বালক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ গণহত্যায় নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়াও বহু অসহায় নারী, শিশু ও মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন।
শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস (খুলনা-৬)
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির ২৩ নম্বর সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে তিনি বাগেরহাটে স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। পাকবাহিনীর সহযোগী হিসাবে অত্যাচার, লুণ্ঠন ও নারী ধর্ষণে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর আত্মগোপনে থাকলেও জেনারেল জিয়ার শাসনামলে পুনর্বাসিত হন।
মাওলানা হাবিবুর রহমান (চুয়াডাঙ্গা-৩)
বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দীয় মজলিসে শূরার সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি জীবননগরের শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন। এই রাজাকারের নেতৃত্বে কয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাককে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে দালাল আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত ৭শ ৫২ জনের একজন এই স্বাধীনতাবিরোধী হাবিবুর।


